শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে উদযাপন বালুরঘাট দিবস

সংবাদ সারাদিন, বালুরঘাট: প্রত্যেক বছরের ন্যায় এবারেও ভারত ছাড়ো আন্দোলনে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বালুরঘাট দিবস উদযাপন করা হল। মঙ্গলবার বালুরঘাটের ডাঙ্গিতে থাকা ৪২ আন্দোলনের শহিদদের স্মৃতিসৌধে ফুল মালা দিয়ে ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে দিনটি যথাযথ মর্যাদায় উদযাপন করা হয়। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন জেলা পুলিশ সুপার রাহুল দে। এরপর শহিদ বেদীতে একে একে ফুল ও মালা দিয়ে সকলে শহিদের শ্রদ্ধা জানায়। ডাঙ্গির পর বালুরঘাট প্রশাসনিক ভবন চত্বরেও দিনটি উদযাপন করা হয়। প্রশাসনিক ভবন চত্বরে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন জেলা শাসক আয়েশা রানি। এছাড়াও হাজির ছিলেন জেলা তথ্য ও সাংস্কৃতিক আধিকারিক শান্তনু চক্রবর্তী, বালুরঘাট দিবস উদযাপন কমিটির সভাপতি পীযুষ দেব, সম্পাদক সুভাষ চাকি, বিপ্লব খাঁ সহ অন্যান্য বিশিষ্ট জনরা। এবার বালুরঘাট দিবসের ৮০ তম বর্ষ উদযাপন করছে ১৪ সেপ্টেম্বর বালুরঘাট দিবস উদযাপন কমিটির সদস্যরা। এবারও করোনাবিধি মেনে ও সরকারি নির্দেশ মেনেই দিনটি উদযাপন করা হয়। এদিকে বালুরঘাট জেলা প্রশাসনিক ভবনে থাকা বিয়াল্লিশের আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ অনেকদিন আগেই ভেঙে ফেলা হয়েছিল। তা আর নতুন করে তৈরি করা হয়নি। বালুঘাট দিবস উদযাপন কমিটির তরফ থেকে সেই স্মৃতি সৌধ তৈরি করার জন্য একাধিকবার দাবি জানানো হয়েছিল। অবশেষে আজ বালুরঘাটে অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে জেলাশাসক আয়েশা রানি ঘোষণা করেন, দ্রুত সেই স্তম্ভ তৈরি করার কাজ শুরু করা হবে। এছাড়াও সেই সময়কার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ যেগুলো বিকল হয়ে রয়েছে সেগুলো কিভাবে সংরক্ষণ করা যায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে বলে জেলাশাসক জানিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, মহাত্মা গান্ধির ডাকে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বালুরঘাটের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। ১৯৪২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বালুরঘাটের ট্রেজারি বিল্ডিং থেকে ব্রিটিশদের ইউনিয়ন জ্যাক পতাকা নামিয়ে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। সেই সময় প্রায় দুই দিন স্বাধীনতার স্বাদ পান বালুরঘাটবাসী। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ে বালুরঘাটেও। দেশকে পরাধীনতার বন্ধন থেকে মুক্ত করতে ভারতবর্ষে যতগুলি আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল ৪২ সালের এই ভারত ছাড়ো আন্দোলন।

বালুরঘাটের বাসিন্দা স্বাধীনতা সংগ্রামী সরোজ রঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বালুরঘাট শহরের উপকণ্ঠে ডাঙ্গি গ্রামে হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হন আগের দিন রাতে। ১৪ সেপ্টেম্বর তারা বালুরঘাটে এসে শহর অবরুদ্ধ করে দেয়। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় আদালত, পোস্ট অফিস, প্রশাসনিক ভবনে। লুঠপাঠ চলে সমস্ত সরকারি অফিসে। তৎকালীন প্রশাসনিক ভবন বর্তমানে ট্রেজারি বিল্ডিং থেকে ব্রিটিশ ইউনিয়ন জ্যাক পতাকা নামিয়ে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। ভয়ে পালিয়ে যান ব্রিটিশ কর্তারা। দুই দিন স্বাধীন থাকার পর ফের ব্রিটিশ সেনা ফিরে এসে পুনরায় দখল নেয় বালুরঘাটের। চলে ধরপাকড়, অত্যাচার। সেদিনটি স্মরণ করে আজও ১৪ সেপ্টেম্বর সমমর্যাদায় পালিত হয় বালুরঘাট দিবস। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এদিনটি সম মর্যাদায় পালন করা হয় প্রতি বছর। এদিন বালুরঘাট শহরের আত্রেয়ী নদী সংলগ্ন ডাঙ্গির শহিদ বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। যদিও এবার করোনা ও লকডাউনের জন্য র‍্যালি করা হয়নি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ও স্বাস্থ্য বিধি মেনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

এবিষয়ে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার জেলাশাসক আয়েষা রানী বলেন, ১৪ সেপ্টেম্বর সত্যিই একটা গর্বের দিন। কিন্তু আজকে এই অনুষ্ঠান মঞ্চে বসে খারাপ লাগছে। কারণ ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সেই শহিদ স্মৃতি সৌধটা আজ অবদি হয়নি। অনেক কারণে এগুলো অনেক সময় হয়না। কারও উপরে দোষারোপ করে লাভ নেই। তাই এখানে নতুন করে শহিদ স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করা হবে। আশা করছি খুব তাড়াতাড়ি কাজ হবে এবং পরের বছর এখানেই স্থায়ী শহিদ বেদিতে আমরা অনুষ্ঠান হবে বলে আশা করছি।

এবিষয়ে বালুরঘাট দিবস উদযাপন কমেটির সভাপতি পীযুষ কান্তি দেব বলেন, ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ইতিহাসে শহিদদের স্মরণ করতে জেলাপ্রশাসনিক ভবনে একটি বেদি ছিল। যা বছর সাতেক আগে ভেঙে ফেলা হয়েছে। আমরা বহুবার সেই দাবি জানিয়ে আসছিলাম। কিন্তু কেউ কর্ণপাত করেনি। আজকে জেলাশাসক সেখানে স্মৃতি সৌধ নির্মাণের কথা ঘোষণা করায় আমরা খুব খুশি হয়েছি।

Spread the love