দু’দিন আগে মারা যাওয়া দিদার সঙ্গে অভুক্ত অবস্থায় কাটালেন মানসিক ভাবে অসুস্থ নাতনি, চাঞ্চল্য কুমারগঞ্জে

সংবাদ সারাদিন, কুমারগঞ্জ: দু’দিন আগে দিদা মারা গেছে। কিন্তু অবুঝ মেয়ে সেটাও জানত না। ভেবেছিল দিদা শুয়ে আছে। কিছু বাদে হয়তো উঠবে। উঠে তাকে খাবার দেবে। এই করেই কেটে গেছিল দুই দুটা দিন। খাবারের অপেক্ষায় দিদার পাশে দু’দিন ধরে বসেছিল একরত্তি মেয়েটি। কিন্তু দিদার কোন সারা আর মেলেনি। কি করে সারা মিলবে? দিদা যে দু’দিন আগেই পৃথিবীর সব মায়া মমতা ত্যাগ করে চলে গেছেন। দু’দিন আগে দিদা মারা গেলেও রানী চৌধুরী কিছুই বলতে পারেনি প্রতিবেশীদের। বলবেই বা কি করে? আর পাঁচটা মেয়েদের মত যে সুস্থ স্বাভাবিক নয় রানী। সে ছোট থেকেই মানসিক ভাবে অসুস্থ। সেভাবে কথাও বলতে পারে না। এমনকি হাঁটাচলাও ঠিক ভাবে করতে পারে না। মঙ্গলবার বিকেলে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কুমারগঞ্জ ফরেস্ট এলাকার স্মৃতি ঝাঁ(৭২) ঘুমের ঘরে মারা যান। তার দু’দিন পর বৃহস্পতিবার জানতে পারেন স্থানীয়রা। বিষয়টি নজরে আসার পরই খবর দেওয়া হয় কুমারগঞ্জ থানার পুলিশকে। পরে পুলিশের সহায়তায় স্থানীয়রা দেহটিকে উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বালুরঘাট হাসপাতালে পাঠায়। এদিন বিকেলে ময়নাতদন্তের পর দেহটি প্রতিবেশীদের হাতে তুলে দেয়৷ সন্ধ্যের মধ্যে দেহ সৎকার করা হয়।

জানা গেছে, স্মৃতি ঝাঁর স্বামী রুহিণী ঝাঁ অনেকদিন আগেই মারা গেছেন। এক মেয়ে ও তার স্বামীও অনেক দিন আগে মারা গেছেন। এক ছেলে থাকলেও তার কোন খোঁজ নেই। এদিকে স্মৃতিদেবীর মেয়ের মানসিক ভাবে অসুস্থ এক মেয়ে রয়েছে। তাকে নিয়েই কোন রকমে দিন গুজরাতেন তিনি। পাড়া-প্রতিবেশী এবং কিছু সহৃদয় ব্যক্তি স্মৃতিদেবীকে সাহায্য করতেন। কিন্তু বয়সের কারণে বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন তিনি। নাতনি রানীকে নিয়েই সংসার ছিল তাঁর। ছোট থেকেই অভাব-অনটন থাকায় নাতনির চিকিৎসা করাতে পারেননি। যার ফলে আর পাঁচটি মেয়ের মত সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিল না রানী।

এদিকে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ওই এলাকায় পচা দুর্গন্ধ বেরছিল। স্থানীয়দের নজরে আসতেই বৃদ্ধার বাড়ির দিকে এগিয়ে যান। তখনই নজরে আসে বৃদ্ধার ঘর থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। আর তার পাশেই বসে আছে তাঁর নাতনি রানী। স্মৃতিদেবীর মৃত্যুর খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসে কুমারগঞ্জ থানার পুলিশ। সবকিছু খতিয়ে দেখার পর পুলিশের তরফে জানানো হয় গত মঙ্গলবার বিকেলেই মারা যান তিনি। মারা যাওয়া দু’দিন পেরিয়ে যাওয়ায় শরীরে পচন ধরেছিল। যার ফলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। এদিকে ওই বৃদ্ধার নাতনী মৃতদেহ সঙ্গে দু’দিন কাটায়। এমনকি দু’দিন ধরেই অভুক্ত অবস্থায় ছিল সে। বিষয়টি নজরে আসার পরে ওই মানসিকভাবে অসুস্থ নাবালিকাকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেন প্রতিবেশীরা।

এদিকে প্রতিবেশীদের এখন চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ওই মানসিক ভাবে অসুস্থ নাবালিকাকে নিয়ে। কারণ এতদিন পর্যন্ত সে তার দিদার সঙ্গে থাকত। বর্তমানে তার আর কেউ নেই। সে কি ভাবে থাকবে? কোথায় থাকবে? আপাতত ওই নাবালিকাকে প্রতিবেশী একজনের বাড়িতে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিবেশীরা পুরো বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনার চেষ্টা করছেন। প্রশাসনের তরফে ওই নাবালিকাকে কোন হোমে থাকার ব্যবস্থার পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে হয়ত সে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে।

এবিষয়ে প্রতিবেশী রাহুল সরকার বলেন, মানসিকভাবে অসুস্থ ওই নাবালিকাকে নিয়েই তার দিদা থাকতো। তবে বেশ কিছুদিন ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন। দিন দুয়েক আগে মারা গেলে এদিন তাদের নজরে আসে বিষয়টি। দুদিন ধরে মৃত দিদার সঙ্গে অভুক্ত অবস্থায় ছিল তার নাতনি। দিদা মারা যাওয়ায় ওই নাবালিকার কেউ রইল না। তিনি প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছেন নাবালিকার থাকার ও চিকিৎসার জন্য।

অন্যদিকে এবিষয়ে কুমারগঞ্জ থানার আইসি সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বিষয়টি জানতে পেরে মৃতদেহটি উদ্ধার করে তা ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।

Spread the love